নিউ বেল কারাগার—ক্যামেরুনের অন্যতম কুখ্যাত কারাগার। সহিংসতা, অতিরিক্ত বন্দি ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের জন্য বহু বছর ধরেই এটি আলোচনায়। তবে এই কারাগার এখন নতুন এক কারণে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পাচ্ছে। এখানেই গড়ে উঠেছে বন্দিদের নিজস্ব সংগীত স্টুডিও ও রেকর্ড লেবেল ‘জেইল টাইম রেকর্ডস’ (Jail Time Records), যা অনেক বন্দির জীবনে নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে।
কারাগারের ভেতরেই রেকর্ডিং স্টুডিও
নিউ বেল কারাগারের ভেতরে থাকা ছোট্ট একটি রেকর্ডিং স্টুডিও থেকেই তৈরি হচ্ছে গান, মিউজিক ভিডিও এবং অ্যালবাম।
এই স্টুডিও থেকে প্রকাশিত গান ইতোমধ্যে আফ্রিকার বাইরেও জনপ্রিয়তা পেয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকা, যুক্তরাষ্ট্র, আর্জেন্টিনাসহ বিভিন্ন দেশের শ্রোতারাও বন্দিদের গান শুনছেন।
সম্প্রতি কারাগারের ভেতরেই একটি বড় সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, যেখানে শত শত বন্দি অংশ নেন।
‘জেইল টাইম রেকর্ডস’-এর যাত্রা
২০১৮ সালে ইতালীয় শিল্পী ডিওনে রোচ একটি স্বেচ্ছাসেবী কর্মসূচির মাধ্যমে নিউ বেল কারাগারে যান।
সেখানে বন্দিদের র্যাপ পরিবেশনা দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি কারাগার কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে একটি রেকর্ডিং স্টুডিও গড়ে তোলেন।
পরে তাঁর সঙ্গে যুক্ত হন সাবেক বন্দি স্টিভ হাপ্পি, যিনি স্টুডিওটির প্রযোজক ও সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
বন্দিদের গান পাচ্ছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
জেইল টাইম রেকর্ডস থেকে তৈরি হওয়া শিল্পীদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত এমপেরর (Empereur)।
কারাগারের ভেতরে ধারণ করা তাঁর একটি মিউজিক ভিডিও ইউটিউবে ২৪ হাজারের বেশি বার দেখা হয়েছে।
এ ছাড়া সাবেক প্রেসিডেন্সিয়াল গার্ড সদস্য স্টোনও এখান থেকে র্যাপ গান প্রকাশ করেছেন। তিনি নিজের গান ও সংগীতের মাধ্যমে কারাগারের জীবনের কষ্ট, একাকীত্ব এবং পরিবারের প্রতি টান তুলে ধরেছেন।
তথ্যচিত্র জিতেছে আন্তর্জাতিক পুরস্কার
জেইল টাইম রেকর্ডসের কার্যক্রম নিয়ে ছয় বছর ধরে নির্মিত হয়েছে ‘Jail Time Records’ নামে একটি তথ্যচিত্র।
স্টিভ হাপ্পি ও ডিওনে রোচ যৌথভাবে এটি পরিচালনা করেন।
সম্প্রতি নিউইয়র্কের ট্রাইবেকা চলচ্চিত্র উৎসবে তথ্যচিত্রটি সেরা প্রামাণ্যচিত্রসহ তিনটি পুরস্কার অর্জন করেছে।
এই প্রজেক্টের নির্বাহী প্রযোজক হিসেবে ছিলেন অস্কারজয়ী পরিচালক টাইকা ওয়াইতিতি এবং সংগীতশিল্পী রিটা ওরা।
সংগীতই হয়ে উঠেছে পুনর্বাসনের মাধ্যম
প্রকল্পটির উদ্যোক্তাদের মতে, এটি অপরাধকে মহিমান্বিত করার উদ্যোগ নয়।
বরং সংগীতের মাধ্যমে বন্দিদের আত্মসমালোচনা, সৃজনশীলতা এবং সমাজে নতুনভাবে ফিরে আসার মানসিকতা তৈরি করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
স্টিভ হাপ্পির ভাষায়, সংগীত বন্দিদের জন্য এমন একটি মাধ্যম, যা কারাগারের চার দেয়ালের মধ্যেও স্বাধীনতার অনুভূতি এনে দেয়।
নারীদের জন্যও নতুন সুযোগ
শুধু পুরুষ বন্দিরাই নন, নিউ বেল কারাগারের নারী ওয়ার্ডেও এই উদ্যোগ সম্প্রসারণ করা হয়েছে।
২০২২ সালে জেজে (Jeje) নামে প্রথম নারী শিল্পী নিজের আফ্রোবিটস গান প্রকাশ করেন।
পরবর্তীতে ক্যামেরুনের বাইরে বুরকিনা ফাসোর রাজধানী ওয়াগাদুগুর কেন্দ্রীয় কারাগারেও একই ধরনের স্টুডিও চালু করা হয়েছে।
কঠিন বাস্তবতার মাঝেও আশার আলো
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, নিউ বেল কারাগারে ধারণক্ষমতার প্রায় চার গুণ বেশি বন্দি রয়েছে।
অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, সহিংসতা এবং নানা সংকটের মধ্যেও সংগীত বন্দিদের জন্য নতুন স্বপ্ন দেখার সুযোগ তৈরি করেছে।
প্রকল্পটির উদ্যোক্তাদের বিশ্বাস, সৃজনশীলতার মাধ্যমে বন্দিদের সমাজে ইতিবাচকভাবে ফিরিয়ে আনার পথ আরও সহজ হতে পারে।
