ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা উপলক্ষে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ এবং শিয়া সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বাংলাদেশে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে দেশের কিছু আহলে হাদিস আলেম এ বিষয়ে প্রকাশ্যে আপত্তি জানিয়েছেন।
এই প্রেক্ষাপটে অনেকের মনে প্রশ্ন উঠেছে—শিয়া কারা, তাদের বিশ্বাস কী এবং কেন কিছু ইসলামী আলেম তাদের বিষয়ে সমালোচনামূলক অবস্থান গ্রহণ করেন।
শিয়া কারা?
শিয়া ইসলাম মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রধান একটি ধারার অনুসারীদের বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। “শিয়া” শব্দটি আরবি “শিয়াতু আলী” থেকে এসেছে, যার অর্থ “হজরত আলী (রা.)-এর অনুসারী”।
ইসলামের ইতিহাস অনুযায়ী, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর মুসলিম নেতৃত্ব বা খেলাফত নিয়ে মতপার্থক্যের মাধ্যমে সুন্নি ও শিয়া ধারার বিকাশ ঘটে। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিয়া মুসলিম বসবাস করেন, যার মধ্যে ইরান, ইরাক, আজারবাইজান, বাহরাইন ও লেবানন অন্যতম।
মতপার্থক্যের বিষয়গুলো কী?
ইসলামের ইতিহাস ও ধর্মীয় ব্যাখ্যার বিভিন্ন বিষয়ে শিয়া ও সুন্নি আলেমদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে মতপার্থক্য রয়েছে।
বাংলাদেশের কিছু আহলে হাদিস আলেমের দাবি, শিয়া মতবাদের কিছু ধর্মীয় বিশ্বাস ইসলামের মৌলিক আকিদার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাদের অভিযোগ, শিয়া সম্প্রদায়ের কিছু উপদল সাহাবায়ে কেরাম (রা.) সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য করে এবং ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা অনুসরণ করে।
অন্যদিকে শিয়া আলেমরা এসব অভিযোগের অনেকগুলোই প্রত্যাখ্যান করে থাকেন। তারা দাবি করেন, শিয়া ইসলামের নিজস্ব ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা রয়েছে এবং সব শিয়া গোষ্ঠীর বিশ্বাস এক নয়।
বাংলাদেশের কিছু আহলে হাদিস আলেম কেন আপত্তি তুলছেন?
সম্প্রতি ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং আলী খামেনির জানাজায় বাংলাদেশের প্রতিনিধি পাঠানোর বিষয়টি নিয়ে দেশের কিছু আহলে হাদিস আলেম প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছেন।
তাদের বক্তব্য, শিয়া মতবাদকে তারা ইসলামের মূলধারার আকিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে করেন না। এ কারণে শিয়া নেতৃত্বের প্রতি রাষ্ট্রীয় বা আনুষ্ঠানিক সমর্থন দেখানো উচিত নয় বলে তারা মত প্রকাশ করেছেন।
এ বিষয়ে কয়েকজন আলেম জুমার খুতবা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছেন।
শিয়া ও সুন্নি সম্পর্ক নিয়ে কী বলছেন গবেষকেরা?
ইসলামবিষয়ক গবেষকদের মতে, সুন্নি ও শিয়া মুসলিমদের মধ্যে ঐতিহাসিক ও ধর্মতাত্ত্বিক মতপার্থক্য বহু শতাব্দী ধরে বিদ্যমান। তবে বিভিন্ন দেশে এই মতপার্থক্যের প্রকাশভঙ্গি ভিন্ন।
গবেষকেরা মনে করেন, ধর্মীয় সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে আলোচনা করার সময় ঐতিহাসিক তথ্য, বিভিন্ন মতামত এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অবস্থান সমান গুরুত্ব দিয়ে উপস্থাপন করা প্রয়োজন, যাতে পাঠক বিষয়টি ভারসাম্যপূর্ণভাবে বুঝতে পারেন।
শিয়া ও সুন্নি মতপার্থক্য ইসলামের ইতিহাসের একটি দীর্ঘদিনের অধ্যায়। বাংলাদেশেও সময়ে সময়েই এ নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক দেখা যায়। সাম্প্রতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিষয়টি আবার আলোচনায় এলেও বিভিন্ন ইসলামী ধারার নিজস্ব ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও অবস্থান রয়েছে। তাই এ ধরনের বিষয়ে মতামত ও বিশ্বাসকে তথ্য থেকে পৃথকভাবে বিবেচনা করা এবং নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় সূত্র অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
