দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল বেলুচিস্তান সাম্প্রতিক সময়ে আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এই অঞ্চলকে ঘিরে পাকিস্তান, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও আফগানিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের কৌশলগত স্বার্থ জড়িয়ে আছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সশস্ত্র সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
খনিজ সম্পদই আগ্রহের মূল কারণ
বিশ্লেষকদের মতে, বেলুচিস্তান বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ খনিজ অঞ্চল। বিশেষ করে রেকো ডিক (Reko Diq) ও সেইন্দাক এলাকায় বিপুল পরিমাণ কপার ও স্বর্ণের মজুত রয়েছে। চাগাই জেলায় অবস্থিত রেকো ডিককে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অনুত্তোলিত কপার খনিগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বর্তমানে কপারকে কৌশলগত বা ‘ক্রিটিক্যাল মিনারেল’ হিসেবে ধরা হয়। বৈদ্যুতিক যানবাহন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও আধুনিক প্রযুক্তি শিল্পে এর ব্যাপক চাহিদা থাকায় এই সম্পদকে ঘিরে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ক্রমেই বাড়ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ কী?
বেলুচদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, তাদের ভূমির খনিজ সম্পদ উত্তোলন হলেও এর সুফল স্থানীয় জনগণের কাছে পৌঁছায় না। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কোম্পানি ও কেন্দ্রীয় সরকারের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ এবং অর্থনৈতিক সুবিধা সীমিত বলে তারা দাবি করে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈষম্যই দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার অন্যতম কারণ হয়ে রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি আগ্রহ
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রও বেলুচিস্তান অঞ্চলে খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ও বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রকল্প ও খনিজ উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলায় অঞ্চলটি নতুন করে ওয়াশিংটনের কৌশলগত গুরুত্ব পেয়েছে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের বিকল্প উৎস নিশ্চিত করাও যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম লক্ষ্য।
চীনের বিনিয়োগ ও করিডর প্রকল্প
২০১৫ সালে চীন বেলুচিস্তানের গওয়াদর বন্দরকে কেন্দ্র করে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (CPEC) প্রকল্পে বড় বিনিয়োগ শুরু করে। এটি বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে বালুচদের একটি অংশের অভিযোগ, এসব উন্নয়ন প্রকল্পে স্থানীয় জনগণের প্রত্যাশিত সুবিধা নিশ্চিত হয়নি। ফলে বিভিন্ন সময়ে চীনা নাগরিক ও প্রকল্পকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনাও ঘটেছে।
পাকিস্তানের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ
চীনের হাজার হাজার নাগরিক বর্তমানে পাকিস্তানের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ করছেন। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পাকিস্তান সরকার বিশেষ নিরাপত্তা ইউনিট গঠন করেছে।
পাকিস্তান সরকারের অভিযোগ, বেলুচিস্তানের সহিংসতায় বিদেশি শক্তির প্রভাব রয়েছে। অন্যদিকে ভারত এ ধরনের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে। দুই দেশের মধ্যে এ ইস্যু নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই কূটনৈতিক উত্তেজনা রয়েছে।
ইরান ও আফগানিস্তানের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ
বেলুচ জনগোষ্ঠীর একটি অংশ ইরান ও আফগানিস্তানেও বসবাস করে। ফলে সীমান্ত নিরাপত্তা, বিচ্ছিন্নতাবাদ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে এই দুই দেশও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে।
ইরান অতীতে সীমান্তবর্তী এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে। একই সঙ্গে পাকিস্তানের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতাও জোরদার করেছে। অন্যদিকে আফগানিস্তানের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিও বেলুচ ইস্যুকে নতুন মাত্রা দিয়েছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে উদ্বেগ
বেলুচিস্তান প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হলেও পাকিস্তানের সবচেয়ে দরিদ্র অঞ্চলগুলোর একটি। সরকারি অর্থনৈতিক জরিপ অনুযায়ী, প্রদেশটিতে দারিদ্র্যের হার জাতীয় গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
পর্যবেক্ষকদের মতে, অর্থনৈতিক বৈষম্য, উন্নয়নের অসম বণ্টন এবং রাজনৈতিক অসন্তোষ একসঙ্গে মিলেই অঞ্চলটির সংকটকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বেলুচিস্তান শুধু পাকিস্তানের একটি প্রদেশ নয়; এটি এখন বৈশ্বিক ভূরাজনীতি, খনিজ সম্পদ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। একদিকে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রতিযোগিতা, অন্যদিকে স্থানীয় জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দাবির কারণে অঞ্চলটির পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠছে।
দীর্ঘমেয়াদে এই সংকটের টেকসই সমাধানে নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি এবং উন্নয়নের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
