সংসার গুছিয়ে নেওয়ার আগেই ডেঙ্গুতে চলে গেলেন চিকিৎসক আঁচল
বিয়ের পর ধীরে ধীরে সংসার গুছিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন চিকিৎসক দম্পতি বিপ্লব চন্দ্র দাস ও আঁচল রায়। খিলগাঁওয়ে ছোট্ট একটি বাসাও ভাড়া নিয়েছিলেন তাঁরা। ফ্রিজ, আসবাবসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও কিনেছিলেন। ভবিষ্যতে বরিশালে গিয়ে নতুন করে সংসার শুরু করার পরিকল্পনাও ছিল।
কিন্তু সেই পরিকল্পনা আর পূর্ণ হলো না। বিয়ের দেড় বছরের মাথায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন চিকিৎসক আঁচল রায়। ২৭ সেপ্টেম্বর রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
বিয়ের পরও আলাদা শহরে ছিলেন দুজন
বিপ্লব ও আঁচলের পরিচয় নোয়াখালী মেডিকেল কলেজে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে তাঁদের সম্পর্কের শুরু। পরে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় তাঁদের।
গত বছরের ১৮ এপ্রিল ঢাকায় তাঁদের বিয়ে হয়। তিন দিন পর বরিশালে হয় বউভাত। দুজনই চিকিৎসক হওয়ায় চাকরি ও দায়িত্বের কারণে বিয়ের পর নিয়মিত একসঙ্গে থাকা সম্ভব হয়নি।
আঁচল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় এবং বিপ্লব জামালপুরে কর্মরত ছিলেন। পরে তাঁদের কর্মস্থল আরও আলাদা হয়ে যায়। ছুটি বা ঢাকায় কাজ থাকলে দেখা হতো দুজনের।
সংসার সাজানোর স্বপ্ন ছিল
খিলগাঁওয়ে আঁচলের মা–বাবার বাসার কাছেই একটি বাসা ভাড়া নিয়েছিলেন তাঁরা। ধীরে ধীরে সেখানে সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র যোগ করছিলেন।
৪৫তম বিসিএসে স্বাস্থ্য ক্যাডারে বিপ্লব সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর তাঁদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাতেও পরিবর্তন আসে। বরিশালে পোস্টিং নিয়ে সেখানে নতুন করে সংসার শুরু করার কথা ভাবছিলেন তাঁরা। সংসার কিছুটা গুছিয়ে নেওয়ার পর সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনাও ছিল তাঁদের।
কিন্তু ডেঙ্গু সেই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে থামিয়ে দেয়।
২১ সেপ্টেম্বর শুরু হয় জ্বর
আঁচলের জ্বর আসে ২১ সেপ্টেম্বর। জ্বর থাকা অবস্থাতেও সেদিন স্বামীর সঙ্গে পূজার কেনাকাটা করেছিলেন তিনি। পরে পরীক্ষা করানো হলে তাঁর প্লাটিলেট ছিল এক লাখ।
স্বামী বিপ্লব তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তবে তখন আঁচল হাসপাতালে যেতে রাজি হননি। তিনি পরিস্থিতি খারাপ হলে হাসপাতালে যাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।
এরপর দ্রুত তাঁর প্লাটিলেট কমতে থাকে। ২৫ হাজারে নেমে গেলে ২৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
আইসিইউতে চিকিৎসা, তবু বাঁচানো গেল না
হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর আঁচলের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হয়। তাঁকে এইচডিইউ ও পরে আইসিইউতে নেওয়া হয়। চিকিৎসকেরা বিভিন্ন পদ্ধতিতে তাঁকে সুস্থ করার চেষ্টা করেন।
আঁচলের চিকিৎসায় চিকিৎসকদের পাশাপাশি তাঁর স্বামী বিপ্লবও যুক্ত ছিলেন। তিনি একদিকে চিকিৎসক হিসেবে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্তে অংশ নেন, অন্যদিকে স্বামী হিসেবে স্ত্রীর পাশে থাকার চেষ্টা করেন।
আইসিইউতে থাকা স্ত্রীকে সাহস দিতে বিপ্লব বলতেন, “তুমি ফাইটার, তুমি ফিরবে।” চিকিৎসক হিসেবে পরিস্থিতির কঠিন দিকগুলো জানা থাকলেও স্বামী হিসেবে তিনি বিশ্বাস করতে চেয়েছিলেন, আঁচল তাঁকে ছেড়ে যাবেন না।
শেষ পর্যন্ত ২৭ সেপ্টেম্বর মারা যান আঁচল।
মেধাবী চিকিৎসক হিসেবে পরিচিত ছিলেন আঁচল
আঁচল ও বিপ্লব দুজনই চিকিৎসক ছিলেন। পড়াশোনার প্রতি আঁচলের গভীর মনোযোগ ছিল বলে জানান তাঁর স্বামী।
২০২৪ সালের ১৪ নভেম্বর এমআরসিপি পার্ট ওয়ান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার খবর তিনি ফেসবুকে পিন করে রেখেছিলেন। বিভাগীয় পরীক্ষাতেও পাস করেছিলেন তিনি।
মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোলজি বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার হিসেবে কর্মরত ছিলেন আঁচল। তাঁর চাকরি স্থায়ীকরণের তালিকায় শিগগিরই নাম আসার কথা ছিল।
ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে সচেতন ছিলেন দুজন
বিপ্লব জানান, তাঁরা দুজনই ডেঙ্গু নিয়ে সচেতন ছিলেন। বাসায় মশারি ব্যবহার করতেন এবং মশার কামড় এড়ানোর চেষ্টা করতেন।
তবে আঁচল কোথায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন, তা তাঁরা জানতে পারেননি। কাজের প্রয়োজনে তাঁকে হাসপাতালসহ বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়েছিল।
যে ছবিটি আঁচল দেখে যেতে পারেননি
আঁচলের মৃত্যুর পর ২৮ সেপ্টেম্বর তাঁদের দুজনের একটি ছবি ফেসবুকে পোস্ট করেন বিপ্লব। ছবিতে তাঁর পরনে ছিল আঁচলের দেওয়া পাঞ্জাবি। আর আঁচলের শাড়িটি দিয়েছিলেন বিপ্লবের ছোট বোন।
ছবিটি আগেই প্রকাশ করার কথা থাকলেও ব্যস্ততার কারণে তা হয়ে ওঠেনি। আঁচল এ নিয়ে অভিমানও করেছিলেন। কিন্তু তিনি বেঁচে থাকতে ছবিটি আর পোস্ট করা হয়নি।
অসমাপ্ত থেকে গেল সংসারের স্বপ্ন
স্ত্রীকে হারানোর পর বিপ্লব তাঁদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আবেগঘন কথা লিখেছেন। দুজনের একসঙ্গে থাকার যে স্বপ্ন ছিল, তা আর পূরণ হলো না।
খিলগাঁওয়ের সেই বাসা, কেনা আসবাবপত্র এবং একসঙ্গে দেখা ভবিষ্যতের পরিকল্পনাগুলো এখন আঁচলের স্মৃতি হয়ে আছে।
আঁচলের চাওয়া ছিল সাদা ফুল
আঁচল মাঝেমধ্যে মজা করে বলতেন, তিনি যদি বিপ্লবের আগে মারা যান, তাহলে যেন তাঁর সমাধিতে সাদা ফুল নিয়ে যাওয়া হয়।
২৭ সেপ্টেম্বর সেই কথাই বাস্তব হয়ে যায়। বিপ্লব তাঁর স্ত্রীকে শেষ বিদায় জানাতে সাদা গোলাপ নিয়ে যান।
বিপ্লব বলেন, আঁচলের বলা সেই কথার কথা মনে রেখেই তিনি সাদা গোলাপ নিয়ে গিয়েছিলেন।
