Homeসারাদেশহাসপাতালে নেওয়ার পথে ৫ বছর ৯ মাসে মৃত্যু ৩০০ কারাবন্দীর

হাসপাতালে নেওয়ার পথে ৫ বছর ৯ মাসে মৃত্যু ৩০০ কারাবন্দীর

৫ বছর ৯ মাসে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যু ৩০০ কারাবন্দীর

বাংলাদেশের কারাগারগুলোতে বন্দীর সংখ্যা ধারণক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি। এর সঙ্গে চিকিৎসক, অ্যাম্বুলেন্স ও চিকিৎসাসুবিধার সংকটও রয়েছে। কারা অধিদপ্তর ও বিভিন্ন হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত প্রায় ৫ বছর ৯ মাসে ১ হাজার ২৩৫ জন বন্দীর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৩০০ জন কারাগার থেকে হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মারা গেছেন।

বর্তমানে দেশের ৭৫টি কারাগারে ধারণক্ষমতা ৪৫ হাজার ১৮৬ জন হলেও বন্দীর সংখ্যা ১ লাখ ৬ হাজারের বেশি। ফলে ধারণক্ষমতার তুলনায় বন্দীর সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি।

হাসপাতালে নেওয়ার পথেই কেন মৃত্যু

কারা অধিদপ্তর জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে কারাগার থেকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে বন্দীদের মৃত্যুর ঘটনা বেড়েছে। গত ২৫ জানুয়ারি সব জেল সুপারকে পাঠানো এক চিঠিতে বিষয়টিকে উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

কারা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, চিকিৎসক, নার্স ও অ্যাম্বুলেন্সের সংকটের পাশাপাশি বাইরের হাসপাতালে বন্দীদের নেওয়ার ক্ষেত্রেও সময়ক্ষেপণ হচ্ছে।

বিশেষ করে ঢাকার ক্ষেত্রে যানজট একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে গুরুতর অসুস্থ বন্দীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিতে অনেক সময় কয়েক ঘণ্টা লেগে যায়। এ সময়ের মধ্যেই কোনো কোনো বন্দীর মৃত্যু হচ্ছে বলে কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

কারাগারে বন্দীর সংখ্যা ধারণক্ষমতার দ্বিগুণের বেশি

দেশে বর্তমানে ৭৫টি কারাগার রয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি কেন্দ্রীয় এবং ৬০টি জেলা কারাগার।

কারা অধিদপ্তরের হিসাবে সাধারণ সময়ে দেশের কারাগারগুলোতে ৮০ থেকে ৮২ হাজার বন্দী থাকেন। কিন্তু বর্তমানে বন্দীর সংখ্যা ১ লাখ ৬ হাজার ছাড়িয়েছে। বিপরীতে কারাগারগুলোর মোট ধারণক্ষমতা ৪৫ হাজার ১৮৬ জন।

কারাগারে বন্দীর সংখ্যা গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ওয়ার্ল্ড প্রিজন ব্রিফের তথ্যেও ২০১৪ সালের পর থেকে বন্দীর সংখ্যা বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যায়।

চলতি বছর মৃত্যুর হারও বেশি

কারা অধিদপ্তরের জানুয়ারি থেকে আগস্টের হিসাব এবং সেপ্টেম্বরের প্রকাশিত তথ্য মিলিয়ে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের শুরু থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় নয় মাসে অন্তত ২৫১ জন বন্দীর মৃত্যু হয়েছে।

এই হিসাবে চলতি বছরে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ২৮ জন বন্দীর মৃত্যু হয়েছে। ২০২১ সাল থেকে প্রায় পাঁচ বছর নয় মাসের হিসাবে মাসিক গড় মৃত্যু ছিল প্রায় ১৮ জন। অর্থাৎ চলতি বছরে বন্দী মৃত্যুর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি।

কারা হাসপাতালে চিকিৎসক সংকট

দেশের ৭৫টি কারা হাসপাতালের জন্য অনুমোদিত চিকিৎসকের পদ রয়েছে ১৪৮টি। কিন্তু স্থায়ী চিকিৎসক আছেন মাত্র দুজন।

কারা সূত্র জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট জেলার সিভিল সার্জনের কার্যালয় থেকে ১০১ জন চিকিৎসক অস্থায়ী ভিত্তিতে কারা হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁরা দিনে কয়েক ঘণ্টা অবস্থান করেন। ফলে দিনের পরবর্তী সময়ে কোনো বন্দী অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

কারাগারগুলোতে নিয়ম অনুযায়ী মানসিক চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও তা নেই। প্রায় তিন হাজার নারী বন্দীর জন্য কোনো গাইনি চিকিৎসকও নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অ্যাম্বুলেন্সও প্রয়োজনের তুলনায় কম

৭৫টি কারা হাসপাতালের জন্য অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে মাত্র ২৭টি।

কোনো অসুস্থ বন্দীকে কারা হাসপাতাল থেকে বাইরের হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন হলে অনেক সময় অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যায় না। তখন অন্য যানবাহনে করে রোগীকে স্থানান্তর করতে হয়। এসব যানবাহনে অক্সিজেন দেওয়ার ব্যবস্থাও থাকে না।

কারা হাসপাতালের চিকিৎসা সুবিধার সীমাবদ্ধতার কারণে গুরুতর অসুস্থ বন্দীদের ঢাকা মেডিকেল, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় কিডনি রোগ ও ইউরোলজি ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত হাসপাতালে পাঠানো হয়। তবে চিকিৎসক ও জনবলের সংকটে কারা হাসপাতালেই প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা অনেক সময় করা সম্ভব হয় না।

সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকজন বন্দীর মৃত্যু

সাম্প্রতিক সময়েও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এবং হাসপাতালে নেওয়ার সময় একাধিক বন্দীর মৃত্যু হয়েছে।

২৬ সেপ্টেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মাত্র ৪০ মিনিটের ব্যবধানে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের দুই বন্দীর মৃত্যু হয়। তাঁরা হলেন পরশ তালুকদার ও স্বপন চন্দ্র দাস। তাঁদের একজনকে হাসপাতালে নেওয়ার পরপরই মৃত ঘোষণা করা হয়।

এর আগে ২৩ সেপ্টেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের আরও দুই বন্দী চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তাঁদের বয়স ছিল ৪০ বছরের নিচে। ২৪ সেপ্টেম্বর ফরিদপুর জেলা কারাগারের এক বন্দীরও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়।

বন্দীদের নানা রোগে নিয়মিত চিকিৎসা প্রয়োজন

কারা অধিদপ্তর ও কারা হাসপাতাল সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, অনেক বন্দী হৃদ্‌রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি ও লিভারের রোগ, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন অসুস্থতায় ভুগছেন।

এ ধরনের রোগীদের নিয়মিত চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন হলেও চিকিৎসক ও অন্যান্য সুবিধার সীমাবদ্ধতার কারণে তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের এক চিকিৎসকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেখানে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার বন্দী আছেন। হাসপাতালটিতে সাতজন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও সংযুক্ত অবস্থায় আছেন দুজন। দিনে তিন থেকে চার শ বন্দীকে চিকিৎসা দিতে হয় বলেও অস্থায়ী চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন।

বন্দীর চিকিৎসা নিয়ে মানবাধিকার উদ্বেগ

বন্দীদের চিকিৎসা ও জীবন রক্ষার দায়িত্ব নিয়ে মানবাধিকারকর্মীরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২০১৫ সালে বন্দীদের সঙ্গে আচরণের জন্য ন্যূনতম মানদণ্ড গ্রহণ করে, যা নেলসন ম্যান্ডেলা রুলস নামে পরিচিত। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব মানদণ্ডের মূল বক্তব্যের মধ্যে বন্দীদের অমানবিক পরিবেশে না রাখা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করার বিষয় রয়েছে।

মানবাধিকারকর্মী মো. নুর খান বলেন, রাষ্ট্রীয় হেফাজতে থাকা বন্দীদের খাবার, থাকার জায়গা ও চিকিৎসার প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করা দরকার। তাঁর মতে, চিকিৎসক ও পরিবহন সংকটের কারণে রাতে গুরুতর অসুস্থ বন্দীদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব না হলে পরিস্থিতি আরও সংকটজনক হয়ে উঠতে পারে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ