যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের করা ১০ বিলিয়ন ডলারের মানহানি মামলা স্থায়ীভাবে খারিজ করে দিয়েছেন দেশটির একটি ফেডারেল আদালত। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল (WSJ), রুপার্ট মারডক ও সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে করা মামলাটি ‘উইথ প্রেজুডিস’ ভিত্তিতে খারিজ করা হয়েছে। ফলে একই অভিযোগে নতুন করে মামলা করার সুযোগ থাকছে না।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) মিয়ামির ফেডারেল আদালতের বিচারক ড্যারিন পি. গেইলস মামলাটি খারিজের আদেশ দেন। আদালতের মতে, জনপরিচিত ব্যক্তির মানহানি মামলায় প্রয়োজনীয় ‘অ্যাকচুয়াল ম্যালিস’ বা প্রকৃত বিদ্বেষের আইনি মানদণ্ড পূরণ করতে পারেননি ট্রাম্প।
কেন ট্রাম্প মামলা করেছিলেন
মামলাটির সূত্রপাত ২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের একটি প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ২০০৩ সালে জেফরি অ্যাপস্টেইনের ৫০তম জন্মদিন উপলক্ষে তৈরি একটি অ্যালবামে ট্রাম্পের নামে একটি যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ চিঠি ছিল।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে ওই চিঠিতে টাইপ করা লেখা, একজন নগ্ন নারীর অবয়ব এবং ট্রাম্পের নামের স্বাক্ষরের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। ট্রাম্প অবশ্য চিঠিটি নিজের লেখা নয় বলে অস্বীকার করেন এবং প্রতিবেদনটিকে মিথ্যা ও মানহানিকর বলে দাবি করেন।
এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর ট্রাম্প সংবাদমাধ্যমটির বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেন। মামলায় ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, ডাও জোন্স, নিউজ কর্প, রুপার্ট মারডক এবং সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের আসামি করা হয়।
‘অ্যাকচুয়াল ম্যালিস’ প্রমাণ করতে পারেননি ট্রাম্প
মার্কিন আইনে কোনো জনপরিচিত ব্যক্তিকে নিয়ে প্রকাশিত বক্তব্যের ক্ষেত্রে মানহানির মামলা সফল করতে বাদীকে দেখাতে হয় যে প্রকাশক তথ্যটি মিথ্যা জেনেও প্রকাশ করেছেন অথবা সত্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে বেপরোয়া অবহেলা করেছেন।
বিচারক গেইলসের মতে, ট্রাম্পের সংশোধিত অভিযোগেও এমন ‘অ্যাকচুয়াল ম্যালিস’ প্রমাণের মতো পর্যাপ্ত তথ্য ছিল না। তাঁর পর্যবেক্ষণে অভিযোগগুলো ছিল অস্পষ্ট, উপসংহারনির্ভর এবং কিছু ক্ষেত্রে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের মূল প্রতিবেদনের সঙ্গেও অসংগতিপূর্ণ।
বিচারক আরও বলেন, ট্রাম্পের আইনজীবীরা সংবাদপত্রটির অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ত্রুটি দেখানোর চেষ্টা করেছেন। তবে আদালতের দৃষ্টিতে সংশোধিত অভিযোগে সেই প্রচেষ্টা যথেষ্ট ছিল না। Reuters-এর প্রতিবেদনে আদালতের এই অবস্থানকে এমনভাবে তুলে ধরা হয়েছে যে, ট্রাম্পের পক্ষ মূলত প্রতিবেদনটির তদন্তপ্রক্রিয়ায় ত্রুটি খোঁজার চেষ্টা করেছে।
প্রথমবারও মামলা খারিজ হয়েছিল
এটি ছিল একই মামলায় ট্রাম্পের দ্বিতীয় প্রচেষ্টা। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে বিচারক গেইলস প্রথম অভিযোগটি খারিজ করেছিলেন। তবে তখন মামলাটি ‘উইথআউট প্রেজুডিস’ ভিত্তিতে খারিজ হওয়ায় সংশোধিত অভিযোগ দাখিলের সুযোগ ছিল।
এরপর মে মাসে ট্রাম্পের আইনজীবীরা সংশোধিত অভিযোগ জমা দেন। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও অন্যান্য আসামিপক্ষ আবারও মামলা খারিজের আবেদন করে।
শনিবারের আদেশে বিচারক এবার মামলাটি ‘উইথ প্রেজুডিস’ ভিত্তিতে খারিজ করেন। এর অর্থ হলো, একই দাবির ভিত্তিতে এই মামলাটি আবার নতুন করে দাখিল করা যাবে না।
ট্রাম্পের পক্ষ থেকে আপিলের ইঙ্গিত
মামলা খারিজ হলেও ট্রাম্পের আইনি দল জানিয়েছে, তারা আইনি লড়াই চালিয়ে যাবে এবং রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের মালিকপক্ষ আদালতের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে।
অ্যাপস্টেইনের জন্মদিনের চিঠি ঘিরে বিতর্ক
মামলার কেন্দ্রে থাকা চিঠিটি জেফরি অ্যাপস্টেইনের ২০০৩ সালের ৫০তম জন্মদিন উপলক্ষে তৈরি একটি অ্যালবামের অংশ বলে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল।
ট্রাম্প চিঠিটির সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছেন। অন্যদিকে আদালত উল্লেখ করেছে, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল তাদের প্রতিবেদনে ট্রাম্পের অস্বীকৃতির কথাও প্রকাশ করেছিল।
অ্যাপস্টেইন ছিলেন একজন দণ্ডিত যৌন অপরাধী। ২০১৯ সালে ফেডারেল যৌন পাচার মামলার বিচার শুরুর আগে নিউইয়র্কের কারাগারে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল।
একই ধরনের আরও আইনি লড়াই
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে তাঁর আইনি বিরোধ দেখা গেছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের পাশাপাশি অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধেও তাঁর আইনি পদক্ষেপের খবর রয়েছে।
তবে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের বিরুদ্ধে করা এই মামলায় শনিবারের আদালতের আদেশের ফলে একই অভিযোগে নতুন করে মামলা করার পথ বন্ধ হয়ে গেল। ট্রাম্পের পক্ষ থেকে আপিল করা হলে বিষয়টি পরবর্তী আদালতে গড়াতে পারে।
