দুই স্বাস্থ্যকর্মীর হাতে সাড়ে ১০ হাজারের বেশি স্বাভাবিক প্রসব
প্রসববেদনায় থাকা মায়েদের পাশে গভীর রাত কিংবা ভোরেও ছুটে যান তাঁরা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দুটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে স্বাভাবিক প্রসব করানোর ক্ষেত্রে আস্থা ও ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছেন পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা নাজমা আক্তার ও শিরিনা চৌধুরী।
তাঁদের তত্ত্বাবধানে এখন পর্যন্ত সাড়ে ১০ হাজারের বেশি শিশুর স্বাভাবিক জন্ম হয়েছে। এর মধ্যে নাজমা আক্তার গত ১২ বছরে প্রায় ৩ হাজার এবং শিরিনা চৌধুরী ৩৪ বছরে ৭ হাজার ৫৭৩টি স্বাভাবিক প্রসব করিয়েছেন।
১২ বছরে প্রায় ৩ হাজার প্রসব নাজমার
বাঞ্ছারামপুর উপজেলার দরিয়াদৌলত ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা হিসেবে কাজ করছেন নাজমা আক্তার। ২০১৪ সালের ১০ ডিসেম্বর চাকরিতে যোগ দেন তিনি।
২০১৯ সালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছয় মাসের মিডওয়াইফারি প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর তাঁর দক্ষতা ও সুনাম আরও বাড়ে। বর্তমানে বাঞ্ছারামপুরের পাশাপাশি নবীনগর, নরসিংদী ও কুমিল্লার হোমনা থেকেও প্রসূতিরা তাঁর কাছে আসেন।
২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত তাঁর তত্ত্বাবধানে ২ হাজার ৪৪১টি স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে। শুধু চলতি বছরের প্রথম সাত মাসেই তিনি ২৮০ প্রসূতির প্রসবে সহায়তা করেছেন।
এক দিনে সর্বোচ্চ ছয়টি প্রসব
নাজমা জানান, এক দিনে তিনি সর্বোচ্চ ছয়টি প্রসব করিয়েছেন। তাঁর তত্ত্বাবধানে এখন পর্যন্ত ১৫ জোড়া যমজ শিশুর জন্ম হয়েছে।
একবার স্বাস্থ্যকেন্দ্রে টানা ১৭ ঘণ্টায় পাঁচটি স্বাভাবিক প্রসব করানোর অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর।
নাজমার ভাষ্য, দীর্ঘ সময় কাজ করে ক্লান্ত হলেও সুস্থ নবজাতক পৃথিবীর আলো দেখার পর সেই ক্লান্তি আর থাকে না। বর্তমানে তিনি প্রতি মাসে গড়ে ৪০ থেকে ৪৫টি স্বাভাবিক প্রসবে সহায়তা করেন।
টানা কয়েক বছর উপজেলা ও জেলায় সেরা
স্বাভাবিক প্রসবে অবদানের জন্য নাজমা আক্তার ২০২২ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত টানা উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা হয়েছেন।
এ ছাড়া ২০২৪, ২০২৫ ও চলতি বছরেও তিনি জেলার পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ হয়েছেন।
৩৪ বছরে শিরিনার তত্ত্বাবধানে ৭ হাজার ৫৭৩ প্রসব
বিজয়নগর উপজেলার পাহাড়পুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন শিরিনা চৌধুরী।
১৯৯২ সালের জুনে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর দীর্ঘ ৩৪ বছরে তাঁর তত্ত্বাবধানে ৭ হাজার ৫৭৩টি স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯২ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত প্রতি মাসে ৮ থেকে ৯টি এবং ২০১০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মাসে ২৫ থেকে ৩০টি প্রসব করিয়েছেন তিনি। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে এক মাসে ৪৭টি প্রসব করিয়ে নিজের রেকর্ডও গড়েন।
অনলাইনে হিসাব শুরুর পরও শীর্ষে শিরিনা
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর ২০১৯ সাল থেকে অনলাইনে প্রসবের হিসাব সংরক্ষণ করছে। ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত বিজয়নগরের ১০টি স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে মোট ৫ হাজার ৫৫২টি স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে।
এর মধ্যে একাই ২ হাজার ৪৩৯টি প্রসব করিয়েছেন শিরিনা চৌধুরী।
শিরিনার মতে, চাকরির শুরুর দিকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রসব করাতে হতো। পরে মানুষকে সচেতন করে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রসবের বিষয়ে উৎসাহিত করা হয়। সেবার সুনাম ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে দূর-দূরান্ত থেকেও প্রসূতিরা আসতে শুরু করেন।
স্বাস্থ্যসেবায় একাধিক পুরস্কার পেয়েছেন শিরিনা
স্বাস্থ্যসেবায় অবদানের জন্য শিরিনা চৌধুরী জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে একাধিকবার পুরস্কৃত হয়েছেন।
২০১০ সাল থেকে তিনি উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা হয়ে আসছেন। একই সময়ে তাঁর কর্মস্থল স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিও শ্রেষ্ঠ হয়ে আসছে। ২০১৫ সালে তিনি জেলার শ্রেষ্ঠ পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালে পান উপজেলা পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ জয়িতা পুরস্কার।
জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ
নাজমা আক্তার ও শিরিনা চৌধুরী দুজনই জানিয়েছেন, কোনো প্রসূতির শারীরিক অবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলে তাঁরা দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা অন্য হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন।
এ কারণে স্বাভাবিক প্রসবের সময় জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সামনে অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখার পরামর্শও দিয়েছেন তাঁরা।
জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী বলেন, নাজমা ও শিরিনা স্বাভাবিক প্রসবের ক্ষেত্রে জেলায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন এবং তাঁরা অসাধারণ কাজ করে যাচ্ছেন।
স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞদের সংগঠন ওজিএসবির সাবেক সভাপতি রওশন আরা বেগমও তাঁদের কাজের প্রশংসা করেছেন। তাঁর মতে, সারা দেশে নিরাপদ স্বাভাবিক প্রসবের এই ধারা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
