Homeসারাদেশগ্যাস–বিদ্যুৎ সংকট: সমস্যা কোথায়, সমাধানে কী করতে হবে

গ্যাস–বিদ্যুৎ সংকট: সমস্যা কোথায়, সমাধানে কী করতে হবে

গ্যাস–বিদ্যুৎ সংকট: সমস্যা কোথায়, সমাধানে কী করতে হবে

দেশে গ্যাস–বিদ্যুৎ সংকট এখন একাধিক কারণে জটিল হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে গ্যাসের উৎপাদন কমছে। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানিও কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে জ্বালানির দাম।

গ্যাসের অভাবে কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। ফলে কোনো কোনো দিনে লোডশেডিং সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছে সরকারের বড় অঙ্কের বকেয়া থাকায় জ্বালানি আমদানিতেও সমস্যা তৈরি হচ্ছে।

তবে বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কিছু পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব।

গ্যাসের উৎপাদন কমছে, বাড়ছে আমদানিনির্ভরতা

দেশে প্রায় নয় বছর ধরে গ্যাসের উৎপাদন কমতির দিকে। ফলে বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতের চাহিদা পূরণে আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।

এলএনজি আমদানির বড় উৎসগুলোর একটি কাতার। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির সরবরাহ কমেছে। একই সঙ্গে বেড়েছে দাম।

গত বছরের প্রথম আট মাসে বাংলাদেশ ৭১টি এলএনজি কার্গো আমদানি করেছিল। চলতি বছরে একই সময়ে এসেছে ৬৮টি। শুধু জুলাই ও আগস্টে গত বছরের তুলনায় ছয়টি কার্গো কম এসেছে।

সেপ্টেম্বর–অক্টোবরে বাড়তে পারে চাপ

বিশেষজ্ঞদের মতে, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরেও গরম খুব বেশি কমবে না। ফলে বিদ্যুতের চাহিদা তুলনামূলক বেশি থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই দুই মাসে অন্তত ২০টি এলএনজি কার্গো আমদানি করা প্রয়োজন। পর্যাপ্ত কার্গো না এলে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট আরও দীর্ঘ হতে পারে।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে ১০টি এলএনজি কার্গো আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে আটটির ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়েছে।

তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র হতে পারে তাৎক্ষণিক সমাধান

বর্তমান পরিস্থিতিতে গ্যাসের ওপর চাপ কমাতে তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন ব্যবসায়ী ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।

সরকারও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব কেন্দ্র থেকে প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে।

এ জন্য সরকার ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে নিয়মিত বিল পরিশোধ করে জ্বালানি তেল আমদানির সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

এলএনজি নাকি তেল, কোনটিতে খরচ বেশি?

বর্তমান বাজারদর বিবেচনায় এলএনজি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ফার্নেস তেল দিয়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ প্রায় ২১ টাকা ৫১ পয়সা। অন্যদিকে এলএনজির দাম ২৪ ডলার ধরে হিসাব করলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ ২৩ টাকার বেশি হতে পারে।

তবে জ্বালানি আমদানিতে শুল্কের পার্থ্যও গুরুত্বপূর্ণ। ফার্নেস তেলে শুল্ক-কর বেশি হওয়ায় এর প্রকৃত ব্যয় আরও বাড়ে।

তেলচালিত কেন্দ্র বাড়তি ব্যবহার করলে কী হবে?

বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা বাড়িয়ে তেলভিত্তিক উৎপাদন করা গেলে লোডশেডিং কমানোর সুযোগ রয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হিসাবে, তেলচালিত কেন্দ্রগুলো ৮০ শতাংশ সক্ষমতায় চালানো হলে ২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হতে পারে।

কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকেও আরও প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

এতে বিদ্যুতের ঘাটতি কমিয়ে শিল্প ও ব্যবসা সচল রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনেও সমস্যা

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় একটি অংশ কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে আসে। কিন্তু বকেয়া বিলের কারণে কয়লা আমদানিতে সমস্যা তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে কয়েকটি কেন্দ্রের কারিগরি ত্রুটিও উৎপাদন কমিয়েছে।

দেশের আটটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট সক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে উৎপাদন সক্ষমতার তুলনায় কম হয়েছে।

পায়রা, মাতারবাড়ী ও বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রেও বিভিন্ন কারণে উৎপাদন কমেছে। অন্যদিকে ভারতের ঝাড়খন্ডে অবস্থিত আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রেও কয়লা সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় উৎপাদন কমেছে।

দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাস ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট মোকাবিলা করা কঠিন।

নভেম্বর থেকে শীত শুরু হলে বিদ্যুতের চাহিদা কিছুটা কমতে পারে। এতে কয়েক মাস পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সুযোগ পাওয়া যাবে।

তবে সেই সময়টিকে পরবর্তী গ্রীষ্মের প্রস্তুতির জন্য কাজে লাগাতে হবে। মধ্যমেয়াদে সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদে দেশের নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে আরও গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

সংকট মোকাবিলায় টাস্কফোর্সের প্রস্তাব

বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীদের মতে, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান সমস্যাগুলো আলাদাভাবে দেখলে স্থায়ী সমাধান পাওয়া কঠিন।

তাই পেশাজীবী, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট খাতের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে। এই কমিটি স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরি করে সরকারকে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত এলএনজি সংগ্রহের পাশাপাশি তেল ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো, বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া পরিশোধ এবং ভবিষ্যতের জন্য দেশীয় ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোই বড় চ্যালেঞ্জ।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ